ঘড়িয়ালঃ বিলুপ্তির পথে

ঘড়িয়াল বা মিঠাপানির ঘড়িয়াল বাংলাদেশের বিলুপ্তপ্রায় প্রাণীগুলোর মধ্যে অন্যতম। বর্তমানে বলতে গেলে ঘড়িয়াল একেবারে চিড়িয়াখানাতে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়েছে। পদ্মা, যমুনায় এখন আর আগের মতো ঘড়িয়াল দেখা যায় না। ঘড়িয়াল দেখতে কুমিরের মতো হওয়ায়ই ঘটেছে যত বিপত্তি। মানুষ কুমির মনে করে এদের দেখা মাত্রই আক্রমণ করে।

মানুষের ধারণা এরা কুমিরের মতো মানুষকে কামড়ে দিতে পারে। তবে দেখতে কুমিরের মতো হলেও এরা মানুষের কোন ক্ষতি করে না। ঘড়িয়ালের প্রধান খাদ্য মাছ হওয়ায় এদের অন্য নাম মেছোকুমির। অঞ্চল ভেদে এদের বিভিন্ন নাম-ঘড়িয়াল, ঘড়েল, বাইশাল, মেছোকুমির, গেভিয়াল ইত্যাদি। পৃথিবীতে ঘড়িয়াল পাওয়া যায় কেবল নেপালের কর্ণালী, বাবাই, রাপতিদুন, নারায়ণী এবং কোশী নদীতে। ভারতের গঙ্গা, ব্রহ্মপুত্র, মহানন্দী এবং বাংলাদেশের পদ্মা ও যমুনাতে। সত্তরের দশকে রাজশাহী এবং সিরাজগঞ্জ অঞ্চল থেকে জেলেরা বেশকিছু ঘড়িযাল ধরে মেরে ফেলে। জেলে এবং স্থানীয় মানুষরা অসচেতনতার কারণে বেশ উৎসাহ নিয়েই ঘড়িয়াল মেরে ফেলা হয়েছে। এতো আমাদের জানা হিসেব কিন্তু চোখের আড়ালে যে সব ঘড়িয়াল মারা হয়েছে তার হিসেব আমাদের জানা নেই। ঘড়িয়াল আসলে মিঠাপানির লম্বা ধরনের কুমির। এদের চোয়াল সব কুমিরের চেয়ে লম্বা। লেজের মাথা থেকে বর্ধিত চোয়ালের অগ্রভাগ পর্যন্ত একটি ঘড়িয়াল সর্বাধিক ৩০ ফুট পর্যন্ত লম্বা হতে পারে। বড় ঘড়িয়ালের চোয়াল চার-পাঁচ ফুট পর্যন্ত লম্বা হতে পারে। এ লম্বা চোয়ালে থাকে অনাবৃত ৪৪-৪৮টি দাঁত। চোয়ালে ঘড়ার মতো মাংস ঝুলে থাকে বলেই হয়তো এদের ঘড়িয়াল বলা হয়। এরা পানির বাসিন্দা হলেও একটানা অনেকক্ষণ ডুব দিয়ে থাকতে পারে না। বায়বীয় অক্সিজেনের জন্য কিছুক্ষণ পরপরই পানির উপরে ভেসে ওঠে। সাধারণত বয়স্ক পুরুষ ঘড়িয়াল, মেয়ে অপেক্ষা কয়েক ফুট বড় হয়। বাচ্চা ঘড়িয়ালের রঙ বয়স্কদের চেয়ে উজ্জ্বল। বয়স্করা কালচে ধূসর।

লোকজনের উপস্থিতি কম থাকলে বা জেলেরা ও নৌকার মাঝিরা বেশি বিরক্ত না করলে ঘড়িয়াল প্রায় সারাদিন ধরে বালুবেলায় পড়ে থাকতে ভালোবাসে। যখন দিনের বেলায় এ কাজের সুযোগ মেলে না তখন রাতেও বালুবেলায় ওঠে আসে। বালুবেলায় শুয়ে থাকার সময় ঘড়িয়াল মস্তবড় হা-করার অভ্যাসটি কিছুতেই থামাতে পারে না। তাই অনেকেই ভয় পায়।

সব কুমিরের মধ্যে ঘড়িয়ালের চোয়াল মাছ ধরার জন্য সবচেয়ে যুৎসই। খাদ্যবস্তু হঠাৎ করে দুই চোয়ালের ফাঁদে, দাঁতের মধ্যে গেঁথে ফেলে। এদের প্রধান প্রাকৃতিক খাবার হচ্ছে আঁইশবিহীন মাছ, বোয়াল, আইর, গুজি পাঙ্গাস ইত্যাদি। এরা যেমন মাছ ধ্বংস করতে ওস্তাদ তেমনি দামী মাছদের ফলন বাড়াতেও সহায়তা করে। ঘড়িয়াল ফাল্গুন-চৈত্র মাসে পদ্মা-যমুনার বালুকাময় তীরে ডিম-পাড়ে। ডিম-পাড়ার জন্য মা-ঘড়িয়াল দু-তিনফুট গর্ত করে নেয়। ডিমপাড়া শেষ হলে ঐ গর্তটি আবার বালু দিয়ে ঢেকে দিয়ে তার পাশে-পাশে পাহারায় থাকে। যাতে কেউ ডিম নষ্ট করতে না পারে। বাচ্চা ঘড়িয়াল জন্মের সময় ১০/১২ ইঞ্চি লম্বা থাকে। প্রথম-দু-তিন বছরে তাদের সর্বাধিক বৃদ্ধি হয়। এ সময় তারা ৫ ফুটের মতো লম্বা হয়।

মিঠাপানির ঘড়িয়াল সাধারণত লাজুক প্রকৃতি হলেও ডিম দেয়ার মৌসুমে বেশ সাহসী হয়ে ওঠে। তখন বাসায় আশে-পাশে কেউ আসলে তাকে আক্রমণ করে। তবে ঘড়িয়াল হিংস্র প্রকৃতির নয়। ঘড়িয়ালের এক নম্বর শত্রু মানুষ। দুই নম্বর এবং প্রাকৃতিক শত্রু ঘড়িয়াল নিজেরাই, ও অপরাপর কুমির। মানুষ ঘড়িয়ালের চামড়া দিয়ে জুতা, সেন্ডেল, ভ্যানিটি ব্যাগ, মানি ব্যাগ ইত্যাদি বানায়; মাংস খায়, বাসা ভেঙে দেয়, ডিম নষ্ট করে, বাচ্চা মারে, জাল পেতে জ্যান্তগুলো ধরে অথবা গুলি করে বা হারপুনের সাহায্যে হত্যা করে আনন্দ পায়। পারতপক্ষে ঘড়িয়ালের কোন প্রাকৃতিক শত্রু নেই। ঘড়িয়াল-ছানা শিকারি পাখি, মাছ, মুরাল, কুমির এবং বোয়াল জাতীয় রাক্ষুসে মাছের পেটে চলে যায়। বাংলাদেশের নদীগুলোর ব্যাপক জায়গা জুড়ে চর পড়েছে।

আর সে সব জায়গায় মানুষের বসবাস শুরু হওয়ায় ঘড়িয়ালের বংশবৃদ্ধিতে বাধা পড়েছে। এছাড়াও নির্বিবাদে হত্যা এবং সরকারের উদাসীনতার কারণে বর্তমানে ঘড়িয়াল আমাদের দেশে বিলুপ্তপ্রায় ও বিপন্ন এসব প্রাণীদের বাঁচিয়ে রাখার দায়িত্ব আমাদের সবার। কারণ আমাদের স্বার্থেই তাদের বাঁচিয়ে রাখতে হবে। ইংরেজী নাম gavial. বৈজ্ঞানিক নাম- gavialisgangeticus

তথ্যসুত্রঃ আখতার হোসেন, দৈনিক আজাদী ছবিঃ সংগ্রহ