সাঁওতাল রূপকথাঃ মানব সৃষ্টির ইতিবৃত্ত

সাঁওতাল রূপকথাঃ মানব সৃষ্টির ইতিবৃত্ত

সূর্য উদয়ের দিকে মানবের জন্ম। পৃথিবী জলময়, আর জলের নীচে মৃত্তিকা। ঠাকুরজিউ, জলজ প্রানী সকল, কাকড়া, কুমীর, হাঙ্গর, রাঘব বোয়াল, গলাদা চিংড়িসহ বিভিন্ন প্রজাতি মাছ সৃজন করলেন। জলজ প্রানী সৃষ্টির পর ঠাকুর জিউ ভাবলেন এখন কি সৃষ্টি করব? সিদ্ধান্ত গ্রহণ করলেন, মানুষ সৃষ্টি করব। তখন তিনি মাটি দিয়ে মানুষ তৈরী শুরু করলেন, মানুষের রূপ গড়া সম্পূর্ণ হল। মানুষরূপী প্রতিমা দুটিকে রৌদ্রে শুকাতে দিয়েছেন। শুকানো হলেই দুটিতে পান বায়ু সঞ্চার করবেন। ইতোমধ্যে উপর থেকে সূর্য দেতার ঘোড়া “সিঞ সাদম” মর্তে জলপান করার জন্য অবতনের সময় মনুষ্য মূর্তি দুটি তার পায়ের আঘাতে গুড়িয়ে যায়। এতে ঠাকুর জিউ অত্যন্ত ব্যথিত হলেন।

ঠাকুর জিউ সংকল্প করলেন মাটির মানুষ আর গড়ব না। পাখী সৃষ্টি করব। তারপরে তিনি তার নিজ অঙ্গের অর্থাৎ কণ্টের নীচে যে হাড় আছে তার উপরের অংশ দিয়ে হাঁস, হাসিল নামক দুটি পাখী গড়লেন। যে অংশ থেকে হাঁস গড়লেন সাওতালরা ঐ অঙ্গকে হাঁস জাং বলে। তাই অঙ্গের নামানুসারে পাখি দুটির নাম হলো হাঁস ও হাঁসিল। হাঁস-হাসিল গড়ার পর ঠাকুর জিউ তাদের হাতের তালুতে রেখে দেখছেন নিজের সৃষ্টিতে নিজে বিমোহিত। পাখি দুটিকে অত্যন্ত সুন্দর লাগছে। পাখি দুটিকে ফু দিয়ে প্রান বায়ু সঞ্চার করলেন। প্রান পেয়ে তারা জীবন্ত হয়ে গেল এবং আকাশে উড়ে গেল। তারা কেবল উড়তেই থাকল বসার কোথাও কোন স্থল নেই, বসার জায়গা নেই, তাই তারা ঠাকুর জিউ হাতের উপর এসে বসত।

সূর্য দেবের ঘোড়া সিঞ সাদম তড়ে সূতাম দিয়ে মর্তে জলপান করতে নেমে এলন। জলপান করার সময় তার মুখ থেকে কিছু ফেনা জলের উপর ছড়িয়ে গেল। এ ফেনা জলের উপর ভেসে থাকল। জলের উপরে এ ফেনা জমাট বেধে ফেড় সৃষ্টি হল। তখন ঠাকুর জিউ পাখি দুটিকে বললেন যাও তোমরা ওই ফেনার উপরে গিয়ে বস। পাখি দুটি তখন তার উপরে বসল। বসলে পর ঐ জমাটবদ্ধ ফেনা তাদেরকে নৌকার মত ভাসিয়ে নিয়ে বেড়ায়। একদিন তারা ঠাকুরজিউকে নিবেদন করল ঠাকুরজিউ পরিভ্রমন করছি মনের আনন্দে, কিন্তু আহার পাচ্ছি না।

তখন ঠাকুর জিউ কুমীরকে ডেকে পাঠালেন, কুমীর এলো। কুমীর ঠাকুরজিউকে বিণীত ভাবে বললেন ঠাকুর, কেন আমাকে স্মরণ করেছেন? ঠাকুর বললেন মাটি উত্তোলন করতে পারবে? কুমীর জলের নীচ থেকে কামড়ে মুখে করে মাটি আনতেছিল কিন্তু সব গলে গেল। কুমীর মাটি আনতে ব্যর্থ হল।

তারপরে ঠাকুর জিউ গলদা চিংড়িকে ডাকলেন। সে আসল, এসে ঠাকুরজিউকে বললেন, ঠাকুর আমাকে কেন তলব করেছেন? ঠাকুর বললেন মাটি তুলতে পারবে? গলদা চিংড়ি জবাবে বলল আপনি যদি বলেন তবে নিশ্চয় তুলতে পারব। তখন চিংড়ি গভীর জলে ডুব দিল, ডাটম করে মাটি তুলে আনতেছিল কিন্তু সব গলে গেল।

তখন ঠাকুর রাঘব বোয়ালকে ডাকলেন, সে এল। এসে ঠাকুরজিকে নিবেদন করল ঠাকুর কি প্রয়োজনে আমাকে স্মরণ করেছেন? ঠাকুর তাকে বলল, মাটি তুলতে পারবে? রাঘব বোয়াল উত্তর দিল আপনি যদি বলেন তাহলে আমি মাটি তুলতে পারব। তখন রাঘব বোয়াল গভীর জলের নীচে মাটিতে কামড় দিয়ে কিছু মাটি মুখে ও কিছু পিঠে নিয়ে রওয়ানা হলো কিন্তু সব গলে গেল। তখন থেকে বোয়াল মাছের আশ খুলে গেল বা আশ আর নেই।

তখন ঠাকুরজি ধিরি কাটকমকে (কাকড়া) ডাকলেন। ধিরি কাটকম হাজির হল। এসে ঠাকুরজিকে বললেন আমাকে কেন ডেকেছেন ঠাকুরজি? ঠাকুরজি তাকে বলল মাটি তুলতে পারবে? ধিরি কাটকম উত্তর দিল আপনি বললে নিশ্চয় তুলতে পারবো। তখন ধিরি কাটকম গভীর জলে ডুব দিল এবং ডাটক করে মাটি আনতেছিল কিন্তু সব গলে গেল, তার সকল প্রচেষ্টা ব্যর্থ হল।

তারপরে ঠাকুরজিউ কেঁচোকে ডাকলেন কেঁচো আসল। এসে ঠাকুরজিকে বিনীত ভাবে বললেন ঠাকুরজি কি প্রয়োজনে আমাকে স্মরণ করেছেন। ঠাকুরজি তাকে বলল, জলের গভীর তলদেশ থেকে মাটি তুলতে পারবে? কেঁচো ঠাকুরজিকে প্রতি উত্তর করল আপনি অনুমিত দিলে তুলতে পারি যদি জলের উপরে কূর্ম (কচ্ছপ) স্থির হয়ে থাকে। তখন ঠাকুরজি কচ্ছপকে ডাকলেন সে আসল, এসে ঠাকুরজিকে বললেন ঠাকুর কেন আমাকে ডেকেছেন। ঠাকুরজি বললেন কেউ মাটি তুলতে পারছেনা কেঁচো মাটি তোলার দায়িত্ব নিয়েছে যদি তুমি জলের উপরে স্থির হয়ে দাড়াও। কচ্ছপ ঠাকুরজির প্রতি উত্তর দিল, আপনি যদি আদেশ করেন, তাহলে আমি দাড়াব। তখন কচ্ছপ জলের উপরে স্থির হলেন স্থির হলে পর, ঠাকুরজি তার চার পায়ে শিকল বেঁধে টেনে দিলেন। এমনি অবস্থায় কচ্ছপ জলের উপরে স্থির হলেন। তখন কেঁচো মাটি তোলার জন্য গভীর জলে ডুব দিলেন, মাটির স্পর্শ পেলেন, তার লেজ এর প্রান্ত কচ্ছপের পিঠে অন্যদিকে মুখ দিয়ে সে মাটি খেতে শুরু করল এবং কচ্ছপের পিঠে মাটি রাখতে লাগল। সে মাটি সর এর মত (Cream এর মত)  জমতে শুরু করল। কচ্ছপ এক নাগাড়ে মাটি তুলছেই, কচ্ছপের পিঠ মাটিতে পূর্ণ হলো। তখন কেঁচো মাটি তোলা বন্ধ করল এবং বিশ্রাম নিল।

তারপরে ঠাকুরজিউ উত্তোলিত মাটিতে মই টেনে দিলেন, মই টানতে টানতে কিছু মাটি শক্ত হলো। শেষে মইয়ে লেগে থাকা মাটি তিনি ঝেড়ে ফেললেন এ ঝেড়ে মাটি গুলোতে পাহাড়, পর্বত সৃষ্টি হলো। মাটি তোলা শেষ পলে পর, মাটির উপরে সে “ফেড় দা” Cream এর মত জল নির্গত হচ্ছিল তা শুকিয়ে গেল তখন ঠাকুরজি ঐ ‘ফেড়” লাগানো মাটিতে (সিরাম বীজ) বিন্নার বীজ ছড়িয়ে দিলেন; তা অঙ্কুরিত হলে পর তিনি দুর্বা ঘাসের বীব ছড়িয়ে তা জন্মালেন, তারপরে কারাম বৃক্ষ তারপরে তপে সারজম (এক ধরণের শালগাছ) লাকড় আতনা, লাডেয়া মাতকত। তারপরে তাবৎ লতাগল্ম বৃক্ষরাজী সৃষ্টি করলেন। ধরিনী শক্ত হল। যেখানে যেখানে জল ছিল সেখানে মাটির চাপা দিলেন আর যেখানে যেখানে জলের ধারা (ভুমবুক) নির্গত হচ্ছে সেখানে সেখানে বড় বড় পাথর চাপা দিলেন।
তারপরে চতুষ্পদ প্রানী সকল ও দ্বিপদ পক্ষী সকল সৃষ্টি করলেন। মাটির পোকা সকল (হাসা গান্ডার) সৃষ্টি করলেন।

মানব সৃজনঃ

অপরূপ ধার্তি (পৃথিবী) সৃষ্টি হল। দিন যায়; এক সময় হাঁস-হাসিল সিরাম দান্ধিতে (বিন্না ঝোপে) বাসা বাধল, হাসিল দুটি ডিম প্রসব করল। হাসিল ডিমে তা দেয়, আর পুরুষ হাসটি খাদ্য সংগ্রহ করে আনে এভাবে করতে করতে একদিন ডিম ফুটল। আশ্চর্য! ডিম থেকে দুটি মানব শিশুর জন্ম হয়েছে। একটি পুরুষ শিশু ও অন্যটি মেয়ে শিশ।

এমনি সন্ধিক্ষণে হাস-হাসিল মহা চিন্তিত। কর্তব্য বিমুঢ় তখন তারা হমর সুরে (বিলাপ করে)

হায় হায় জালা পুরিরে

হায় হায় নুকিন মানেআ

হায় হায় বুসৗড় আকান কিন,

হায় হায় নুকিন মানেআ

হায় হায় তকারে দহকিন।

হায় হায় এহো ঠাকুরজিউ

হায় হায় মারাং ঠাকুরজিউ।

হায় হায় বুসৗঢ় আকানকিন

হায় হায় একিন মানেআ

হায় হায় তকারে দহকিন।

বঙ্গানুবাদ-

হায় হায় এ দুটি মানব

হায় হায় জন্ম নিয়েছে

হায় হায় এ দুটি মানব

হায় হায় কোথায় রাখিব।

হায় হায় ওহে ঠাকুরজী

হায় হায় পরম ঠাকুরজী

হায় হায় জনম নিয়েছে

হায় হায় এ দুটি মানব

হায় হায় কোথায় রাখিব।

হাঁস-হাসিলের করুন আর্তি, আকুল আবেদনে ঠাকুরজি সাড়া দিলেন। তাদের সামনে প্রকট হলেন তারা ঠাকুরজিকে নিবেদন করল কেমন করে এ মানব দুটিকে বাচাব? ঠাকুরজিউ তাদেরকে তুলো দিলেন এবং বললেন তোমরা যা যা খাও তার রস বের করে এ তুলো ভিজিয়ে নিও এবং এদেরকে চুষে খাওয়াবে। তারা ঠাকুর জিউ এর শিক্ষা মতে অনুরুপ ভাবে খাওয়াতে লাগল। শিশু দুটি চুষে খেয়ে হাটতে শিখল। শিশু দুটি বড় হতে হতে হাস-হাসিল চিন্তিত হল। বড় হলে এদেরকে কোথায় রাখা হবে।

তখন তারা আবার ঠাকুরজিউকে স্মরণ করলেন; তখন ঠাকুরজিউ তাদেরকে উপদেশ দিলেন তোমরা উড়ে গিয়ে এদের থাকার জন্য জায়গা পচ্ছন্দ করে আস। তখন তারা সূর্য অস্তের দিকে উড়ে গেল। প্রকৃতির নৈসর্গ লীলা ভূমি (হিহিড়ি-পিপিড়ি) এলাকাটি পছন্দ করল। ফিরে এসে তারা ঠাকুরজিউকে তাদের পছন্দমত জায়গার বিবরণ জানাল। তখন তিনি তাদেরকে বললেন অতি উত্তম। এখন তোমরা এদেরকে সেখানে নিয়ে যাও। তখন হাঁস-হাসিল শিশু দুটিকে পিঠে করে উড়ে নিয়ে যেখানে পৌঁছে দিল।

যেহেতু তাদের জন্মস্থান থেকে সূর্য অস্তের দিকে তাদেরকে পৌঁছে দেয়া হল, এই জন্যই এ পুরা কাহিনী মতে বলা হয়ে থাকে মানবের জন্ম সূর্য উদয়ের দিকে। হিহিড়ি-পিপিড়ি মানব শিশু দুটিকে পৌঁছে দেয়ারপর হাঁস-হাসিল দুটি কোথায় অন্তর্ধন হলেন সে বিষয়ে কোন বর্ণনা নেই। হয়তোবা মানব জন্মের লীলার জন্যই তাদের আগমন ঘটেছিল।